উদ্যোক্তাপাড়ায় এই বিতর্ক নতুন নয়। কলেজে পড়ার সময় আমিও মনে করতাম আইডিয়াই বুঝি বড়।
কিন্তু পরে জানলাম, আইডিয়ার চাইতে এক্সিকিউশন বড়।
এই কথাটা আমাকে তিনজন প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা বলেছিলেনঃ
 
১) গুগল এশিয়ার রিজিওনাল হেড বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত বিট্রিশ নাগরিক জনাব ভিকি রাসেল। (উনার সাথে দীর্ঘক্ষন আলাপ হয়েছিলো বনানীতে একটা আইডিয়া ডিসকাশন সেশনে)
২) অন্যরকম গ্রুপের কর্ণধার সোহাগ ভাই।
৩) সিডনীর একজন মাল্টিমিলিওনিয়ার লেবানিজ-খ্রিস্টান সেইফ, যে আমাকে পেঁয়াজ কাটার এক্টা বিশেষ পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন।
 
উদাহরণ দেইঃ আপনার আশে পাশেই দেখবেন প্রচুর লোকজন অওসাম সব আইডিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিভিন্ন আড্ডাতে সেগুলো শেয়ারও হয় অনেক সময়। অনেকে শুরুও করে সাহস করে, কিন্তু কিছুদিন পরেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে যথাযথ এক্সিকিউশনের অভাবে।
আবার দেখবেন, একটা আইডিয়া হিট করেছে যেটা মোটেও কোন ইউনিক আইডিয়া ছিলো না, কিন্তু শুধুমাত্র সঠিক এক্সিকিউশনের জন্য সেটা সাকসেসফুল হয়েছে। ফেসবুকের আগে হাইফাইভ ছিল, ইয়াহু কমিউনিটি ছিলো, তারা কিছুই করতে পারেনি। ফেসবুকের চাইতেও সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বেটার আইডিয়া ছিল গুগলের কাছে, শুরুও করেছিলো (গুগল ওয়েভ, গুগল প্লাস), কিন্তু ফেসবুকের মত ”টাইমলি” এক্সিকিউশন করতে পারেনি বিধায় দুটাই আজ কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
দেশীয় উদাহরণ হতে পারেঃ এখানেই ডট কম
 
এখন হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন এর কথা! তারা বাংলাদেশ থেকে বিজনেস গুটিয়ে নিয়েছে কয়েক বছর আগেই। অথচ বিক্রয় ডট কম কিন্তু মুটামুটি সফলতার সাথেই টিকে আছে এখন পর্যন্ত।
দুটো আইডিয়া হুবহু এক। কিন্তু এক্সিকিউশনে ভিন্নতা (পড়ুন ”ভুল”) থাকার কারণে আজ একটা সফল, আরেকটা বিফল। (এখানেই ডট কম কেন ফ্লপ খেলো, সেটা নিয়ে আমার নিজস্ব একটা একাডেমিক কেইস স্টাডি আছে।)
এইরকম অনেক উদাহরণ পাবেন টেক দুনিয়ায়। একই ধরনের ডজনখানেক আইডিয়া থাকার পরেও দেখবেন স্রেফ একটা আইডিয়া হিট করেছে সারা দুনিয়াতে। স্রেফ এক্সিকিউশনের মুন্সিয়ানায়, আইডিয়ার নয়।
 
এক্সিকিউশন যে আইডিয়ার চাইতে বড়, তার সবচাইতে বড় প্রমান হলো, আপনার আইডিয়া যতই স্বতন্ত্র আর আধুনিক-যুগোপযগী হোক না কেন, সঠিক এক্সিকিউশনের অভাবে তা আলোর মুখ দেখবে না। তো আইডিয়াই যদি বড় হতো, তাহলে তো এমনটা হবার কথা ছিলো না, তাই না?
ফেইলড্ আইডিয়ার কথা আমরা খুব একটা শুনি না, কিন্তু সফলতার মুখ দেখা আইডিয়ার কথাই আমরা শুধু জানতে পারি। হয়তো এই কারণেই অনেকেই ভাবেন আইডিয়াই বুঝি বড়! আর এ কারণেই আমরা সাধারনত ”ইউনিক আইডিয়া” খুজঁতে যতটা ব্যস্ত থাকি, এক্সিকিউশনের বেলায় ততটা থাকি না।
 
As the old adage goes, “it’s easier said than done.”
পৃথিবীতে অনেক ফাটাফাটি ও জোস জোস আইডিয়া আতুঁর ঘরেই মরে গেছে, স্রেফ এক্সিকিউশনের অভাবে। আইডিয়ার এক্সিলেন্সি স্বয়ং আইডিয়াকেই বাঁচাতে পারেনি। কারণ আইডিয়াকে সফল করে সেটার এক্সিকিউশন, আইডিয়া নয়।
আইডিয়াকে বলা যেতে পারে গাছের বীজ। আর এক্সিকিউশন হচ্ছে সূর্যের আলো; বৃষ্টির পানি। বীজ ছাড়া গাছের জন্ম হবে না এটা ঠিক, কিন্তু আলো আর পানি ছাড়া গাছ বাচঁবে না এটা তার চাইতেও বড় সত্য।
 
Ideas don’t make you rich. The correct execution of ideas does.” Felix Dennis. (ফেলিক্স ডেনিশ হচ্ছেন বিখ্যাত বিট্রিশ পাবলিশার, কবি, দানবীর আর উদ্যোক্তা।)
সোহাগ ভাই গত বছর এক পাবলিক স্পিচে বলেছিলেন, ”আমার কাছে অনেক ইউনিক বিজনেস আইডিয়া আছে। কারো আইডিয়া লাগলে আমার অফিসে আসতে পারেন। আমি আইডিয়া তো দিবোই, সেটা এক্সিকিউট করার জন্য যথাসম্ভব বুদ্ধি-পরামর্শও দিবো। এই রকম অনেক বার হয়েছে, আমি আগ্রহীদের আইডিয়া ও পরামর্শ দুটোই দিয়েছিলাম, কিন্তু কেউই তেমন কোন আইডিয়া এক্সিকিউট করতে পারেনি। So, It's all about execution, not idea itself” - এই কথাটা অবশ্য উনি “আমার আইডিয়া অন্যদের সাথে শেয়ার করলে যদি চুরি হয়ে যায়?” প্রসংগে বলেছিলেন।
 
যা হোক, এই প্রসংগে জনাব ভিকিকেও একটু কোট করিঃ
"১) চুরি হবার ভয়ে কখনো আইডিয়া শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনার আইডিয়া হুবহু কেউ নকল করতে পারবে না। কারণ, আইডিয়া এক হলেও একেকজনের এক্সিকিউশন পদ্ধতি একেক রকম।
২) আইডিয়া যদি সত্যিই ঠিকঠাকভাবে চুরি করা যেতো তবে আমরা ফেসবুক, লিংকডইন বা গুগলের মত সেবাগুলোর লোকালাইজড ভার্সন দেখতে পেতাম।
৩) আইডিয়া কারো সাথে শেয়ার করলে সেটা চুরি হবার যতটা সম্ভাবনা রয়েছে, তার চাইতে অনেক বেশী সম্ভাবনা রয়েছে আপনার সেই আইডিয়াটা আরোও উন্নততর হওয়ার। বিদগ্ধজনের পরামর্শ-ফিডব্যাক আপনার আইডিয়াকে আরো শানিত বৈ তুচ্ছ করবে না।"
আমার প্রায় ৫ বছরের পুরনো একটা লেখা থেকে কিয়দংশ হুবহু কোট করছি, যেটা আমি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিতে লিখেছিলামঃ
”তোমরা কি জানো, আমেরিকাতে সিলিকন ভ্যালি নামে একটা জায়গা আছে? যারা স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, সিলিকন ভ্যালি হচ্ছে তাদের স্বপ্ন পূরণ করার জায়গা। সেখানকার প্রায় প্রতিটি মানুষ এক একজন জিনিয়াস, এক একজন উদ্যোক্তা, এক একজন তুমুল সৃস্টিশীল মানুষ।
 
সেখানে তুমি রাস্তা দিয়ে হেটেঁ যেতে যেতে যদি দেখো একটা কিশোর ছেলে বা মেয়ে রোলার স্কুটার চালিয়ে খেলতে খেলতে যাচ্ছে, তুমি মুটামুটি শিওর থাকতে পারো যে, ঐ বাচ্চাটাও একজন সফল উদ্যোক্তা। কোন না কোন ব্যবসা বা সার্ভিস তার আছে। এবং সে নিজেই ওটা চালায়।
 
ওখানে তুমি যদি কোন কফি শপে ঢোকো কফি খাবার জন্য, তবে তোমার আশে পাশের টেবিলে যারা কফি খাবে, তুমি নিশ্চিতভাবে ধরে নেবে, তারা একেক জন ডাকসাইটে উদ্যোক্তা। কেউ হয়তো ফেসবুকে আছেন, কেউবা গুগলে, কেউ এ্যাপলে, কেউ মাইক্রোসফটে, কেউ ড্রপবক্সে, কেউ বা কোরায়, কেউ স্কাইপে বা হোয়াটস এপে। মাল্টি মিলিয়ন ডলারের মালিক একেকজন। তাদের অনেকের হয়তো সো কলড একাডেমিক সার্টিফিকেট নাই কিন্তু এরা সবাই প্রচন্ড মেধাবী, জিনিয়াস, ক্রিয়েটিভ এবং স্বপ্নবাজ।
 
এমনকি যে ওয়েট্রেইসকে তুমি কফি সার্ভ করতে দেখবে, খোজঁ নিয়ে দেখো তারও নিজের একটা ছোট্ট ব্যবসা আছে। এবং সেটা সাকসেসফুল; রানিং বিজনেস। আমি কোন আবেগ তাড়িত বা অতি রঞ্জিত কথা বলছি না। বরং আমি প্রতিটি কথা নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। চাকরীসূত্রে আমাকে দীর্ঘ সময় সিলিকন ভ্যালিতে বসবাস করতে হয়েছিলো।
 
আমাকে এই কথাগুলো বলেছিলেন - গুগলের এশিয়া রিজিওনের হেড, বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ সিটিজেন, ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা জনাব ভিকি রাসেল। বাংলাদেশে গুগল ম্যাপের কার্যক্রম, গুগল ষ্ট্রিট ভিউ এবং উবারের মতো সার্ভিসসহ অন্যান্য স্টার্টাপ খোলার সুযোগ ও সম্ভাবনার ব্যাপারে তার সাথে আমার দীর্ঘক্ষন আলাপ হয়েছে কয়েক মাস আগে। ভদ্রলোক বাংলা বলতে পারেন না, তবে বোঝেন বেশ।”
 
হ্যাঁ, আইডিয়া অবশ্যই বড়। কিন্তু যখন এক্সিকিউশনের সাথে তাকে তুলনা করা হয়, তবে আইডিয়ার চাইতে সেটাকে এক্সিকিউশান করাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং, আইডিয়া < এক্সিকিউশন। (প্রমানিত)
Arrow